দুর্নীতি দমনে সরকারের ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ নেই
Super Admin |
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৫, ০৯:১১
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার যখন শপথ নেয়, প্রায় এক বছর আগে তখন বাংলাদেশ ছিল এক ভয়াবহ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে। এই পরিস্থিতির পেছনে মুখ্য কারণ ছিল মোটাদাগে তিনটি– গণতন্ত্রহীনতা, মানবাধিকার ও ব্যাপক দুর্নীতি। প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণে অধ্যাপক ইউনূস দুর্নীতিকে ‘জাতির প্রধান শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করে বলেছিলেন, তিনি ‘বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিমুক্ত দেশগুলোর একটিতে পরিণত করতে চান।’ বাস্তবতা ভিন্ন বলেই মনে হয়। সংবিধান সংশোধন নিয়ে বেশ আলোচনা দেখা গেলেও দুর্নীতি দমনের কার্যকর প্রক্রিয়া নিয়ে কথা তেমন নেই বললেই চলে।
সরকারের শুরুর দিকে এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি যতটা সাহসী ও ব্যাপক ছিল, এক বছরের কাছাকাছি এসে তার বাস্তবায়ন হয়ে পড়েছে ততটাই দুর্বল ও অগোছালো। এখন সরকার এ বিষয়ে নিষ্ক্রিয় বললেও ভুল হবে না। সরকার গঠনের প্রথম দিকেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ১৫ দিনের মধ্যে সম্পদের বিবরণী জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সেই ১৫ দিন কখনও এক মাস, কখনও ৪৫ দিন পর্যন্ত বর্ধিত হলো। তারপর একসময় নিঃশব্দে হারিয়ে গেল সেই উদ্যোগ। আজ আর কেউ জানে না সেই উদ্যোগের পরিণতি কী হলো।
শুক্রবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদন বলছে, প্রশাসন ক্যাডারের অধিকাংশ কর্মকর্তা সম্পদের হিসাব দিয়েছেন, তবে সব নথি এখন আলমারিতে বন্দি। এগুলো নিয়ে পরবর্তী কার্যক্রম কী, সে বিষয়ে নাকি কোনো নির্দেশনা নেই। অন্য ক্যাডারের কতজন হিসাব দিয়েছেন, তার কোনো খবরই নেই। এমনকি যে আইনে এ হিসাব চাওয়া হয়েছে, সে আইন নাকি তা অনুমোদন করে না। এর জন্য আইনটি সংশোধনের প্রয়োজন ছিল। সে উদ্যোগও নেওয়া হয়নি।
এই একটি উদাহরণই বলে দেয়, দুর্নীতি দমনে অন্তর্বর্তী সরকারের তৎপরতা কতটা দুর্বল ও হতাশাজনক। দেশের মানুষ এখনও আগের মতোই, কোথাও কোথাও আগের চেয়ে বেশি দুর্নীতির শিকার হচ্ছে। সেবার বিনিময়ে ঘুষ দেওয়া এখনও দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে আছে। সরকারি অফিসগুলোতে এখনও ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ হয় না। তাহলে প্রশ্ন জাগে, এই সরকার কি আদৌ দুর্নীতি দমন করতে চেয়েছিল?
সরকারের কোনো পরামর্শদাতা কি হঠাৎ কোনো সরকারি দপ্তরে গিয়ে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা জানার চেষ্টা করেছেন? বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ-বিআরটিএ, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস কিংবা সরকার পরিচালিত হাসপাতালগুলোতে হঠাৎ অভিযান চালিয়ে দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছেন? না। বরং এই অচল কাঠামোর মধ্যেই তারা যেন আরামদায়ক অবস্থানে বসে আছেন।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনো প্রতীকী পদক্ষেপও নেওয়া হয়নি। সাধারণ মানুষের মনে আশা সঞ্চার করার মতো কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি। একবারও কেউ মাঠ পর্যায়ে না গিয়ে শুধু ফাইলপত্র ও আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ থেকেছেন।
বিশেষ করে প্রশাসনে বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে দুর্নীতি আজও প্রকট। বরং এখন ঘুষের অঙ্ক আরও বড় হয়েছে। পার্থক্য এই যে, এখন কর্মকর্তাদের আগের মতো রাজনৈতিক নেতাদের খুব একটা ভাগ দিতে হয় না। অভিযোগ আছে, বর্তমান কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশই ছিল আগের সরকারের দোসর, যারা ক্ষমতা ধরে রাখতে গণতন্ত্র ও সাধারণ মানুষের জীবনকে জলাঞ্জলি দিয়েছিল। তাদের স্বপদে বহাল থাকাও সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলার জন্য যথেষ্ট।
এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হলো, বর্তমান সরকারের অনেকে বাস্তবতা থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন। দীর্ঘদিন এনজিও ও বিদেশি সংস্থার সঙ্গে কাজ করেছেন, তবে সাধারণ মানুষের সঙ্গে খুব কমই মেলামেশা করেছেন। গুলশান বা বারিধারার কফিশপে বসে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণ চলে, তবে এতে সেক্রেটারিয়েট বা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দুর্ভোগ অজানাই থাকে।
দেশের মানুষ আজও সেই একই চক্রে বন্দি– একটি ব্যর্থ সিস্টেম, যেটি তাদের জীবনকে নিত্যদিন অবমূল্যায়ন করে। দুর্নীতি দমনের ব্যর্থতার ফলে দেশের মানুষ আজও সরকারি সেবা পেতে কষ্ট পাচ্ছে, নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। এমনকি দুর্নীতির বিরুদ্ধে এতদিন সবচেয়ে বেশি সোচ্চার মানুষ বা সংস্থাগুলোও রহস্যজনক কারণে আজ প্রায় নীরব দর্শক।
দুর্নীতি কীভাবে রাষ্ট্র ও সমাজকে কুরে কুরে খায়, তা কারও অজানা নয়। বিশ্বব্যাংকের ওই সমীক্ষার ফল সবাই জানেন, যেখানে বলা হয়েছিল, দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশের অন্তত ২ শতাংশ বার্ষিক জিডিপির অপচয় ঘটে। সমাজে বৈষম্যও যে এ কারণে তরতরিয়ে বাড়ছে, সে বিষয়টিও অজানা নয়। অথচ যে আন্দোলনে বিগত সরকারকে উৎখাত করা হলো, তার প্রধান দাবি ছিল সব ক্ষেত্রে বৈষম্যের অবসান।
এখনও সময় আছে, সরকার দুর্নীতি নির্মূল না হোক, অন্তত নিয়ন্ত্রণে শক্ত পদক্ষেপ নিতে পারে।
আরাফাত আশওয়াদ ইসলাম: গুলশান সোসাইটির নির্বাহী কমিটির সদস্য